Showing posts with label Education. Show all posts
Showing posts with label Education. Show all posts

Thursday, February 29, 2024

অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী স্মরণে।


অধ্যক্ষ এম এ বারী
ছবিটি স্যারের জৈষ্ঠ পুত্র জনাব
সাজ্জাদুল বারী’র নিকট থেকে সংগৃহীত। 
আমার প্রথম বস অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী। আজ থেকে ঊনত্রিশ বছর আগে যাঁর অধীনে শিক্ষকতা শুরু করতে পেরে আজও গর্ব বোধ করি।
আজ ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ।
বামনী কলেজ'র প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী স্যার এর ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী । মরহুম বারী স্যারকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরন করছি ।

দিনটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৩ জুলাই ।
আগে তাঁকে কখনও দেখিনি। সেদিনই স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা । দিনটি ছিল বামনী কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ইন্টারভিউ। শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ হলেও আয়োজনের অবয়ব, লোকজনের উপস্থিতি, শতাধিক লোকের দুপুরে মেজবানি খাবার ব্যবস্থা এসব কিছু দেখে সেটাকে যে কেউ ছোট খাটো বিয়ে, খৎনা বা আকিকার অনুষ্ঠানও মনে করতে পারতো । বামনী কলেজের অফিসিয়াল জন্ম ১৯৯৪খ্রী.। আজকের পূর্ন যৌবনা বামনী কলেজের জন্ম হয় মূলত বামনী হাই স্কুলের পুরোনো ক্যাম্পাস'র এক পরিত্যক্ত কুড়ে ঘরে । বর্তমানে যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন। নিজের ঘর না থাকায় অন্যের ঘরেই যার জন্ম, তার জন্ম পরবর্তী সকল অনুষ্ঠান অন্যের ঘরে হবে এটাই স্বাভাবিক । সঙ্গত কারনে প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ইন্টারভিউটি অনুষ্ঠিত হয় বর্তমানের বিশাল ক্যাম্পাসে অবস্থিত বামনী হাই স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জনাব সফিউল্যাহ বিএসসি এর অফিস কক্ষে । চাকুরির পরীক্ষা বললে এটা ছিল আমার দ্বিতীয় ভাইভা পরীক্ষা । তার কিছুদিন আগে ১৬ তম বিসিএস এর মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবনে । আমার ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন পিএসসি’র চেয়ারম্যান জনাব এসএমএ ফায়েজ যিঁনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছিলেন । ঐ বোর্ডের সদস্য ছিলেন চেয়ারম্যান সহ পাঁচজন । চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য কারও নামই জানা সম্ভব হয়নি । তবে অন্যান্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে আগে পরে আলাপকালে জেনেছি একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক, একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান, অপর দু’জনের পরিচয় জানতে পারিনি । সালাম জানিয়ে পরীক্ষার্থীর জন্য রাখা নির্ধারিত চেয়ারটিতে অনুমতি নিয়ে বসলাম। মূলত চাকরির পরীক্ষায় এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম ভাইভা। সেসন জটে পড়ে সরকারি চাকরির বয়সও একেবারে শেষ প্রান্তে। ঐ সময় একজন শিক্ষার্থীর প্রতি পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের অন্যতম প্রধান চাওয়াই থাকতো শিক্ষা জীবন শেষে একটা বড় সরকারী চাকুরী পাওয়া। তাই চাকুরিটা পেতেই হবে এমন একটা মানষিক চাপ থাকায় কিছুটা নার্ভাসনেসও কাজ করছিল। চেয়ারম্যান স্যারই প্রথম শুরু করেছিলেন আমার নামের এ এস এম এর পূর্ণ রূপ জানতে চেয়ে। প্রাসঙ্গিক দু'চারটি কথার পরই সাবজেক্ট এর দক্ষতা যাচাই হলো। এটাতে তেমন খারাপ করিনি বলেই মনে হয়েছে। ধরাটা খেয়েছি ইংরেজি দক্ষতা যাচাই এর অংশে। এইচএসসি পর্যন্ত আমাদের সময় অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই ইংরেজি দক্ষতা ছিল Prose ও Poetry থেকে সিলেক্টেড কয়েকটি Broad and Short Question এর Answer, কয়েকটি সিলেক্টেড Explanation, কয়েকটি Summary আর The Cow, Student Life, Aim in Life, Rainy Season এর মত কয়েকটি নির্ধারিত Eassy আর Paragraph মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেকারণে সীমিত সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে Conversational English প্রয়োগে দক্ষতা প্রদর্শন করা ছিল কঠিন ব্যাপার।
প্রথম ইংরেজি প্রশ্নটাই বুঝতে পারিনি। নার্ভাস ফিল করছিলাম। চেয়ারম্যান স্যার একই প্রশ্ন বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন। উত্তর দিতে পেরেছি। এবার তাঁরা প্রশ্নের ধরণও পাল্টালেন। বোর্ডের সামনে প্রায় পনের মিনিট ধরে যাচাই বাছাই এর সময় যেখানে আটকে যাচ্ছিলাম সেখানেই যুবরাজের মত চেহারার অধিকারী ফায়েজ স্যার আপনজনের মতোই কৌশলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমিও আমার পেশাগত জীবনে স্থানীয় কয়েকটি নন গভার্নমেন্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় শুরুতে যাদের পারফরমেন্স মোটামুটি ভালো লেগেছে তাদেরকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছি। এক্ষেত্রে ফায়েজ স্যার এর আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ভূমিকার কথা সবসময় মনে পড়তো।
যাই হোক, ভাইভা পরবর্তী সময়ে মনে কিছুটা আত্মবিশ্বাস উঁকি ঝুঁকি মারছিল। তখন ইন্টারনেট ভিত্তিক মিডিয়া না থাকায় রেজাল্ট জানা যেত পিএসসির নোটিশ বোর্ড আর পরের দিনের জাতীয় পত্রিকায় । বিটিভি'র খবরে শুধু ফলাফল প্রকাশ হয়েছে বলে জানা যেত। বিটিভি'র খবর শুনেই পিএসসিতে যাই রেজাল্ট দেখতে। বর্তমানে সাতকানিয়া সরকারি কলেজে কর্মরত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জনাব জসীম উদ্দিন আহমেদ সহ একসঙ্গে পিএসসিতে প্রবেশ করি নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট দেখতে। জসীম ভাই সফল হলেও ভাগ্য আমার সহায় হয়নি।
১৬ তম বিসিএস ছিল সরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগের স্পেশাল বিসিএস। প্রিলিমিনারী টেস্ট, সাইকোলজিক্যাল টেস্ট কোয়ালিফাই করে তবেই ভাইভা । ছাত্র জীবনে লেখাপড়ার প্রতি আমার তেমন সিরিয়াসনেস না থাকলেও ১৪শ বিসিএস এ কোয়ালিফাই করা প্রতিবেশী মেধাবী সিনিয়র ভাই প্রফেসর আবু জাফর মোহাম্মদ সাদেক এবং ১৩ তম বিসিএস এ কোয়ালিফাই করা মেধাবী সহপাঠী প্রফেসর আবু মোহাম্মদ রহিম উল্লাহ এর সফলতা আমাকে বিসিএস এর প্রস্তুতিতে অনেকটা উদ্দীপনা যুগিয়েছিল। অল্প কয়েক মাস রাত দিন পরিশ্রম করেছি কিন্তু খুব দ্রুতই টের পেয়েছি -একাডেমিক শিক্ষা জীবনের এত বড় ঘাটতি এত সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। আমার ব্যর্থতার প্রধানতম কারণ ছিল শিক্ষা জীবন শেষ করে তারপর চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া । এটা সম্পূর্ণ ভুল কনসেপ্ট। বিসিএস ও অন্য সকল ক্যারিয়ারের পরীক্ষার জন্য একটি আউটলাইন তৈরি করে নিতে হয় এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতে হয় স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা শুরুর প্রথম দিক থেকেই।
বামনী কলেজের সেদিনের শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা পরীক্ষাটা আমার কাছে ছিল ছাত্র জীবনের সাময়িক পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতির মতই সাধারণ একটা বিষয় । বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার ডাক পড়লে যখন কক্ষের ভিতরে ঢুকি তখন ব্যাপারটা আর মোটেই সাধারণ ব্যাপার বলে মনে হলোনা । একি ! এত লোক ! এলাহি কান্ড ব্যাপার ! প্রায় জন বিশেক বা তার কিছু বেশি লোকতো হবেই । কয়েক মুহুর্ত্বের জন্য ক্ষানিকটা ভীত হয়েছিলাম । অবশ্য দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে ভাইভার জন্য মানষিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম । ঐ মজলিশের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি যার মুখভরা পাকা দাঁড়ি, কপালে অভিজ্ঞতার অনেকগুলি ভাঁজ, ইনকরা পরিপাটি পোশাক, মাথায় অল্প পরিমান কাঁচা-পাকা চুল, চেহারায় পান্ডিত্যের ভাব, আমার স্পষ্ট মনে আছে তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি বিনম্রভাবে অনুমতি চাইলাম-বসতে পারি স্যার ? তিঁনিই বললেন হ্যাঁ বসুন । কন্ঠের আওয়াজ শুনে মনে হলো ক্লান্তি আছে কিন্ত দেখে বুঝার উপায় নেই ।

সবার দিকে একনজর তাকিয়ে আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সরকারি মুজিব কলেজের বাংলা বিষয়ের অধ্যাপক জনাব শাহজাহান স্যার, কোম্পানীগঞ্জের এযাবত কালের সবচেয়ে স্বনামধন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুজিব কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক সফিউল্যাহ বিএসসি, নুর আহম্মদ চৌধুরী ও আলী আহম্মদ চেয়ারম্যান ছাড়া আর কাউকে চিনতে পারিনি । ঐ বোর্ডে সাবজেক্ট এক্সপার্টদের মধ্যে শাহজাহান স্যারই ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র। আমি যাঁর অনুমতি নিয়ে বসেছিলাম শাহজাহান স্যার তাঁকেই বললেন স্যার আপনিই শুরু করুন । শাহজাহান স্যারের বলার স্টাইল দেখে আমার বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয়নি যে তিঁনি শাহজাহান স্যারের চাইতেও বড় কিছু ।

ইত্তেফাক পত্রিকার বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, পৌরনীতি,সমাজ কল্যাণ, ইসলাম শিক্ষা, ইসলামের ইতিহাস, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান এ ১২ টি বিষয়ের যেহেতু ইন্টারভিউ কল করা হয়েছে সেহেতু উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ১২ জন হবেন সাবজেক্ট এক্সপার্ট । আমার সাবজেক্ট এক্সপার্ট ছিলেন জনাব ছদরুদ্দিন আহমদ Dr-Sadruddin Ahmed তাছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মুজিব কলেজের অধ্যক্ষ, সফিউল্যাহ বিএসসি, নুর আহম্মদ চৌধুরী ও আলী আহম্মদ চেয়ারম্যান সহ আরও ৪/৫ জন । সব মিলিয়ে বিশ জনেরও অধিক। এতবড় ভাইভা বোর্ড ফেস করতে গিয়ে যে কারও হাটু কাঁপাটা স্বাভাবিক । যথারীতি ভাইভা শেষে বের হলাম । কেউ একজন বললেন দুপুরে সবার জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা আছে তাই কেউ যেন খাওয়া ছাড়া চলে না যাই । নূর আহম্মদ চেীধুরীর বাড়ীতে খাওয়ার সময় পরিচিত হয়েই মূলত বুঝতে পারি ভাইভা বোর্ডে যাদের চিনতে পারিনি তাঁদের মধ্যে ছিলেন বামনী কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী, সর্বজনাব মৌলভী জামাল উদ্দিন, আবু তাহের কোম্পানী, হাজী তোফাজ্জল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন লাতু ও আরও কয়েকজন । বিগত ঊনত্রিশ বছরে স্থানীয় আরো বহু মানুষকে জেনেছি যাঁদের কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
নূর আহম্মদ চৌধুরীর রাইচ মিলের মাঠে ছোট প্যান্ডেল বানানো হয়েছিল মেহমানদের খাওয়ানোর জন্য। ভিআইপিগণ আগে খাবেন এটাই স্বাভাবিক। খেতে হলে কমপক্ষে ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। একা একা অপেক্ষা করতেও ভালো লাগছেনা। কিছুটা ভীড় দেখে দেরি হবে ভেবে কৌশলে বিদায় হবার জন্যে যখন উদ্যত ঠিক তখনই পাশে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন এক প্রার্থীর দিকে নজর পড়লো। এগিয়ে হাত বাড়িয়ে পরিচিত হলাম। জানলাম তিনি ফারুখ হোসেন মোঃ নিজামী Faruk Hossain বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের প্রার্থী। সামান্য কথোপকথনে তাঁর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হলাম। দু'জন এক সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় সেই গাছের নিচেই কাটালাম। আগে যারা খেয়েছেন তাদের খাওয়া পরবর্তী তৃপ্তিকর আলোচনা থেকে বুঝতে পারলাম ভালো আয়োজন করা হয়েছে। বামনী এলাকার আতিথেয়তার সুনাম আমি ছোটবেলা থেকেই জানতাম। চৌধুরীর রাইচ মিলের ম্যানেজার আমাদের দুজনকে খেতে ডাকলেন। আয়োজকের অনুমানের চেয়ে মেহমান বেশি হবার কারণে আমাদের শেষের কয়জনকে শুধু লাউ আর পাতলা কলাই ডাল দিয়েই খেতে হয়েছিল। আসলে রিজিকের ফয়সালাতো আসমানে হয় জমিনে নয়। দু'জন এর ধ্যান ধারণা যথেষ্ট মিল থাকায় এই সহকর্মী ফারুক ভাইয়ের সাথেই সবচেয়ে ভালো কেটেছে পেশাগত জীবনের আটাশটি বছর। ২০২৩ এর ডিসেম্বরে ফারুক ভাই আর আরেক প্রিয় সহকর্মী কাশেম মোঃ কবির উদ্দিন ভাই সুদীর্ঘ আটাশ বছরের পেশাগত জীবন শেষ করে অন্য সব সাধারণ দিনের মতোই একরকম নিরবেই অবসর জীবনে চলে যান কিন্তু বামনী এলাকার অনেকেই হয়তো বিষয়টি জানেন না। বেঁচে থাকলে আগামী বছর ৩১ ডিসেম্বর বুধবার আমাকেও বিদায় নিতে হবে। তবে সেটা সরবে নাকি নিরবে আল্লাহই ভালো জানেন।
ভাইভা বোর্ডে যাঁর অনুমতি প্রার্থনা করে বসেছিলাম তিঁনি আর কেউ নন, তিঁনি হলেন বামনী কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম অধ্যক্ষ অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, অনেক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, ভীষন মজার মানুষ জনাব এম এ বারী । তিঁনি আজ আর বেঁচে নেই । আজ থেকে বাইশ বছর আগে ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী তিঁনি পরলোক গমন করেন । ৩১ আগস্ট ১৯৯৫ আমি বামনী কলেজে আনুষ্ঠানিক যোগদান করি । আমাদের বসার জায়গা বলতে যা ছিল তা হলো বামনী হাই স্কুলের পুরোনো জায়গায় অবস্থিত মাটির ফ্লোর, চারদিকে বেড়া আর টিনের ছাউনিতে তৈরি পরিত্যক্ত ঘরের দেড়শ থেকে দু’শ বর্গফুটের একটি কক্ষ । কক্ষটি ছিল অধ্যক্ষের কার্যালয় কাম শিক্ষক মিলনায়তন কাম একাউন্টস অফিস । অর্থাৎ একের ভিতর তিন । সে কক্ষে ছিল অধ্যক্ষের জন্য একটি পুরোণো টেবিল ও একটি চেয়ার, একপাশে একটি স্টীলের আলমারি, শিক্ষকদের জন্য পুরাতন লক্কর ঝক্কর হাতাবিহীন ৮/১০ টা কাঠের চেয়ার আর হিসাব রক্ষকের জন্য ছোট্র একটি পুরোনো টেবিল । কলেজের শুরুতে আর্থিক এত দৈন্য দশার মধ্যেও প্রতিদিন এক কাপ চা আর একটি খেজুরী ছিল প্রত্যেক শিক্ষক কর্মচারির ফিসিয়ালী রুটিন আপ্যায়ন। খেজুরি হলো চিনি মিশ্রিত ময়দার খামির দিয়ে তৈরি তেলে ভাজা খেজুর আকৃতির এক ধরণের পিঠা। বামনীতে সেটা এখনও পাওয়া যায়। কয়েক মাস আগে হঠাৎ মনে পড়ায় আমরা তিন সহকর্মী বামনী বাজারের আরজু হোটেলে খেতে গিয়েছিলাম।
যাইহোক, আধুনিক যুগে আমরা যেটাকে ওয়াশ রুম বলি তখন ওয়াশ রুমের বিকল্প ছিল এ ঘরটির উত্তর পাশে খোলা আকাশের নিচে কয়েকটি গাছ গাছালির আড়ালে পরিত্যক্ত ২/১ টি ওয়াল ঘেরা …….খানা । সে জায়গাটাকে আমরা সুন্দরের জন্য বাগান বাড়ি বলতাম।
বারী স্যারের সাথে যখন কর্ম জীবন শুরু করি তখন তাঁর বয়স ৬২ বছরের মত । আমাদের অনেকের বয়স ছিল তখন আনুমানিক ২৭ থেকে ৩০ এর মধ্যে । আমরা রুমে ঢুকতেই সালাম দিয়ে ঢুকতাম । আমার স্পষ্ট মনে আছে এ বয়সেও স্যার কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডসেক করতেন তারপর আমাদেরকে বসতে বলে নিজে বসতেন । আমাদের মধ্যে যারা এ ভদ্রতাটুকু শিখেছে তা এম এ বারী স্যারের কাছ থেকেই । বারী স্যার বস হয়েও বসের মত ব্যবহার করতেননা। তিঁনি আচরণ করতেন নেতার মত। ’Be a Leader, Not a Boss’ এ কথাটি জীবনে বহুবার পড়েছি এবং শুনেছি কিন্ত বারী স্যারকে বাস্তবে এমনটা দেখেছি। সেজন্য আমরা অনেকেই আগ্রহের সঙ্গে তাঁর নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতাম। বারী স্যার ছিলেন পিতার মত দায়িত্বশীল, নেতার মত নির্দেশ দাতা, বন্ধুর মত খোলামেলা স্বভাবের।
লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা গ্রামে ১৯৩৫ সালে জনাব এম এ বারীর জন্ম । ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫২ সালে অনার্স ও একই বিষয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে এম এ পাশ করেন । পুরো কর্মজীবনই ছিলেন শিক্ষকতার সঙ্গে । জীবনে প্রায় ১০ টি কলেজে অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের যে অভিজ্ঞতা তিঁনি অর্জন করেছেন তা অন্যের জন্য ছিল অনুকরনীয়, অনুসরনীয় ও শিক্ষনীয় । ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের ছাত্র এবং শিক্ষক হলেও প্রায় সকল বিষয়েই তাঁর দখল ছিল ।
১৯৯৪ সালের সে জীর্নশীর্ন কুড়েঘর থেকে বামনী কলেজ আজ অট্রালিকায় । বামনী কলেজের এমন সুদিন দেখলে দুর্দিনের কান্ডারী বারী স্যার নিশ্চয়ই খুশি হতেন । আজ বামনী কলেজের অনেক কিছু আছে কিন্ত নেই বারী স্যার, আরও নেই বামনী কলেজের দুর্দিনের আরও কয়েক বন্ধু মরহুম সফিউল্লাহ বিএসসি, মরহুম নূর আহম্মদ চৌধুরী, মরহুম আলী আহম্মদ চেয়ারম্যান, মরহুম মৌলভী জামাল উদ্দিন, মরহুম আবু তাহের কোম্পানী, প্রমূখ।
বামনী এলাকার প্রবাসী আমেরিকানদের আর্থিক অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হয় এ কলেজটি। বাবু রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও জনাব হাবিব উল্যাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সর্বজনাব প্রফেসর এ এন এম বিল্লাহ, কামরুজ্জামান মিয়া, মৌলভী জয়নাল,আবু নওশাদ, ইকবাল বাহার চৌধুরী সহ আরও অনেক প্রবাসীর নাম শুনা যেত কলেজ প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত আলোচনা আসলেই।

বারী স্যারের হাত ধরে শুরু হওয়া সময়কাল থেকে টানা ঊনত্রিশ বছর এ পেশায় আছি। কলেজের শুরুতে শিক্ষার্থীর কোয়ানটিটি ছিল কম কিন্ত কোয়ালিটি ছিল বেশি। এখন কোয়ানটিটি বেড়েছে কিন্ত ধ্বস নেমেছে কোয়ালিটিতে। ব্যবস্থাপনার ছাত্র হিসেবে সব কিছুতে সবার আগে ব্যবস্থাপনাকে দেখার অভ্যাস (কারও কারও মতে বধ অভ্যাস) আমার শিক্ষা জীবন থেকেই। ২৮-২৯ বছরের পেশাগত জীবনে বহু রুপের ব্যবস্থাপনা দেখেছি। যেটিকে আমার শিক্ষার সঙ্গে মিলাতে পেরেছি সেটিকে সমর্থন করেছি আর যেটি সমর্থনযোগ্য নয় সেটি ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেনে নিয়েছি।

কি পাওয়ার কথা ছিল? কি পেয়েছি? যা পেয়েছি তা কিভাবে পেয়েছি? যা পাইনি তা কেন পাইনি? এসব ছোট ছোট প্রশ্নের বড় বড় উত্তর আছে। বৈচিত্র না থাকলেও ২৮/২৯ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা নেহায়েত কম নয়। এ সময়ের ময়না তদন্ত করলে তার রিপোর্ট দিয়ে রীতিমত একটি ছোটখাটো উপন্যাস লেখা যাবে।

দুঃখ প্রকাশঃ

প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ের অবতারনা করতে গিয়ে লেখাটির অবয়ব বৃদ্ধি হয়েছে যা হয়তো সম্মানিত পাঠককের বিরক্তির কারণ হতে পারে। আশাকরি সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

শেষকথাঃ
মরহুম এম এ বারী ছিলেন আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, বিনয়ী, সদালাপী, বন্ধুভাবাপন্ন, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, ধর্মপরায়ন ও একজন মজার মানুষ । এমন একজন গুনীজনের সান্নিধ্যে অল্প ক’টা দিন থাকতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত ধন্য মনে করছি। আজ ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে মরহুম এম এ বারী স্যারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি । একই সঙ্গে বামনী কলেজ পরিবারের যেসব সদস্য পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তাঁদের কর্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি । প্রার্থনা করছি আল্লাহ যেন তাঁদের সকলকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করেন । আমীন।

[ লেখকঃ এ এস এম কামাল উদ্দিন ]

বি. দ্র. - লেখাটি ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ আমার ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য লেখা হয়েছিল। আরও অধিক পাঠকের পড়ার সুবিধার্থে লেখাটি আমার এ ব্যক্তিগত ব্লগেও পোস্ট করে রাখা হলো।

Tuesday, September 18, 2018

আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব : আকর্ষণীয় গুণের সমাহার |

ইংরেজি ‘Personality’ শব্দ’র আভিধানিক অর্থ হলো ‘ব্যক্তিত্ব’ ।আর ‘ব্যক্তিত্ব’ বলতে একজন ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশ্লেষিত সামগ্রিক মূল্যায়ন বা ফলকে বুঝায় ।একজন ব্যক্তির মধ্যে যে সকল বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় এগুলি সাধারণত ব্যক্তি যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে বা বসবাস করে সে পরিবেশ থেকে অর্জিত হয় । একজন ব্যক্তির মধ্যে ভাল মন্দ দু’ধরনের বৈশিষ্ট্যই কম বেশি থাকতে পারে । মহা মনীষীদের কথা বাদ দিলে প্রত্যেক সাধারণ ব্যক্তি বা মানুষই অল্প বিস্তর দোষ-গুণের সমন্বয়ে গঠিত । এসব দোষ-গুণের মাত্রা বা পরিমানের উপরই একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায় । অর্থাৎ ভাল এবং মন্দ বৈশিষ্ট্যের সমষ্টির বিয়োগফলই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব পরিমাপের সাধারণ ও সহজ উপায় ।

বাস্তব জীবনে আমরা ‘ব্যক্তিত্ববান’ ও ‘ব্যক্তিত্বহীন’ শব্দ দু’টির বহুল ব্যবহার দেখলেও বাস্তবে কোন মানুষই ‘ব্যক্তিত্বহীন’ নয় । প্রত্যেক মানুষেরই ব্যক্তিত্ব আছে শুধু পার্থক্য হলো কারও ব্যক্তিত্ব সবল বা আকর্ষণীয় (Strong Personality) আর কারও ব্যক্তিত্ব দুর্বল বা আকর্ষণহীন (Weak Personality) । যাঁদের দোষ বা মন্দের চেয়ে গুণ বা ভাল বৈশিষ্ট্য বেশি তাঁরা সবল ব্যক্তিত্ব বা Strong Personality ’র অধিকারী আর এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিগণ দুর্বল ব্যক্তিত্ব বা Weak Personality ’র অধিকারী ।

যে সকল বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব পরিমাপের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলির মধ্যে ব্যক্তির চালচলন, আচার ব্যবহার, কথা বার্তা, চিন্তা ভাবনা, রুচি পছন্দ, সততা, ন্যায় পরায়নতা, দৃষ্টিভঙ্গী, বিশ্বাস, প্রকাশ ভঙ্গি, কমন সেন্স, স্বার্থপরতা, দায়িত্বশীলতা, কর্ম দক্ষতা, নেতৃত্বদান ক্ষমতা, ধৈর্য্য, সহনশীলতা, সমর্থন, বিরোধীতা, দৃঢ়তা, ক্ষমা প্রদর্শন, স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান, শারিরীক ভাষা ইত্যাদি সহ আরও বহু বহু বিষয় জড়িত রয়েছে ।এসব বিষয়ের অধিকাংশগুলিতে যখন ব্যক্তির গুণ প্রকাশ পাবে তখন তাঁকে বলা যাবে সবল ব্যক্তিত্বের বা Strong Personality ’র অধিকারী ।

সবল বা দুর্বল যাই বলিনা কেন ব্যক্তিত্ব কখনও গায়ের জোরে বা আত্ন প্রচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার বিষয় নয় । এটি সম্পূর্ন অনুশীলন পূর্বক অর্জনের বিজয় ।আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা কর্মকান্ডের মধ্যেই আমাদের ব্যক্তিত্বের ধরন ফুটে ওঠে । শুধুমাত্র ভাবগম্ভীর হয়ে থেকে অন্যদের সাথে দুরত্ব বজায় রেখে স্বল্পভাষী হলেই যদি উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া যেত তাহলে এ সহজ পন্থাটি আয়ত্ব করে সবাইতো সবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে যেত ।নিজেকে পরিপাটি করে অন্যদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার নাম যেমন উত্তম ব্যক্তিত্ব নয়, তেমনি অকারনে, অকাতরে, যত্র তত্র, যেন তেন ভাবে নিজেকে উজাড় করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করার নামও উত্তম ব্যক্তিত্ব নয় ।

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা কারণে অকারণে, ইচ্ছায় অনিশ্চায় একে অন্যের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি । এ ব্যক্তিত্ব যুদ্ধে আমরা উভয়ই নিজেকে ব্যক্তিত্ববান প্রমাণ করতে নানা রকম যুক্তি, তর্ক, উপমা ইত্যাদি ব্যবহারে মরিয়া হয়ে উঠি । আবার একে অপরকে ব্যক্তিত্বহীন প্রমাণ করতেও যেকোন ধরনের যুক্তির সঙ্গে কুযুক্তি প্রদর্শনেও দ্বিধা করিনা । কিন্ত একথা আমরা ভুলে যাই যে, নিজেকে ব্যক্তিত্ববান প্রমাণে তর্কে বা ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়াও দুর্বল ব্যক্তিত্বেরই নামান্তর ।

প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে গুণ যেমন আছে তেমনি দোষও আছে । কিন্ত দোষযুক্ত যে দেহ বা মনে গুণ খুঁজতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে সে ব্যক্তি হয়তো অনেক সুন্দর হতে পারে কিন্ত সবল ব্যক্তিত্বের অধিকরী হতে পারেনা । প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একটা পশু শক্তি কাজ করে, এ পশু শক্তিকে যিঁনি যত বেশি অবদমন করতে পারেন তিঁনি তত উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী । 

লেখক : এ এস এম কামাল উদ্দিন



Wednesday, August 29, 2018

কোরবানি


   কোরবানি
===================
কোরবানি হোক একমাত্র
আল্লাহ কে খুশির জন্য,
গোস্ত না হোক শুধুমাত্র
ফ্রিজ ভর্তির পণ্য
কোরবানির পশুর বর্জ্যে
জগৎ না হোক দুষিত,
পরিস্কার আর পরিচ্ছন্নতা
পবিত্রতারই তো শর্ত
পশুর চামড়া হোক শুধু
গরবি লোকদের জন্য, 
গরিবের হক না হয় যেন
সিন্ডিকেট এর পণ্য.
মন যদি থাকে বিদ্বেষে পূর্ন
চিন্তায় যদি শুধু লাভ,
গোস্ত খাওয়ার কোরবানিতে
কী হবে আর ছওয়াব
?
====================
রচনায়ঃ 
এ এস এম কামাল উদ্দিন
তারিখঃ ২১/০৮/২০১৮
====================

Sunday, December 17, 2017

শিক্ষা হোক সেবা শিল্প | পণ্যের কারখানা নয় |

Product  Vs. Service-educationpointbd.blogspot.com
বিগত পর্বে–‘পদ্ধতিই যেখানে অসদুপায় অবলম্বনের অনুপ্রেরণা’ শিরোনামে নিবন্ধটিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বগ্রাসী নকল প্রবনতার বিষয়ে শিক্ষা পদ্ধতির কিছু ত্রুটি সম্পর্কে সাধারনভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি ।
নকল প্রবনতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অতীতেও ছিল, এখনও আছে ।দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য হলো এখন নকলের চরিত্র নগ্নতায় পরিপূর্ন।

এখন নকলকারী শিক্ষার্থী নকলকে অধিকার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় । এখন নকলকারী শিক্ষার্থী নকলের জন্য শিক্ষকের শাসন বারন মানতে রাজি নয় ।আগে লুকিয়ে করত এখন প্রকাশ্যে করতে চায় ।আগে নকলে ধরা পড়লে অনুতপ্ত হতো, শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতো, আর করবেনা বলে প্রতিশ্রুতি দিত, এখন ধরা পড়লে হাসি তামাশায় সেটাকে উপভোগ করতে চায় ।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষনীয় যে, নকল প্রবনতা শহরের শিক্ষার্থীদের চাইতে গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বেশি। আবার গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতন ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নকল প্রবনতা অনেকটা কম ।শহরের এবং গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নকল প্রবনতা কম থাকার প্রধানতম কারন পিতা মাতার সচেতনতা এবং যথাযথ কাউন্সেলিং । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নকলের প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ অসেচেতন । তাঁরা সন্তানের শিক্ষার পিছনে নিজে কোন সময় ব্যয় করেননা ।এদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অভিভাবক শ্রেণি আছেন যাঁরা সন্তানের শিক্ষার পিছনে প্রয়োজনীয় ব্যয় প্রদানে মোটেই কার্পন্য করেননা কিন্ত, সন্তানের লেখাপড়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও প্রাইভেট টিউটরের উপর ।শহরের শিক্ষার্থীরা পিতা মাতা বা অভিভাবকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ তত্বাবধানে যতটা সময় পড়ালেখার পিছনে ব্যয় করে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা ততটা বা তার চেয়েও বেশি সময় পিতা মাতা বা অভিভাবকের তত্বাধানের বাইরে পড়ালেখা ছাড়া অন্য কাজে বেশি ব্যয় করে ।
    
বর্তমানে আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য প্রণীত সিলেবাসের বহর অনেক বড় ।শুধু সিলেবাস কেন শিক্ষার্থীর বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী সাবজেক্টের সংখ্যাও অনেক বেশি ।অনুমোদিত টেক্সট বইয়ের ভাষার কাঠিন্য বেশি হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষেই নিজে থেকে সমস্যা সমাধান সম্ভবপর হয়ে উঠছেনা ।সিলেবাসের ব্যাপকতা, টেক্সট বইয়ের ভাষার কাঠিন্য ইত্যাদি কারনে একজন শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট শিক্ষা বর্ষের মধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুধু লেখাপড়া করা ছাড়া প্রয়োজনীয় খেলাধুলা বা আর কিছুই করার সময় থাকেনা । শহরের পরিবেশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসের সময় ছাড়া শিক্ষার্থীদের বাইরে থাকার সুযোগ কম থাকায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই পড়ালেখায় সময় ব্যয় করতে পারে ।অন্যদিকে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকটাই বিপরীত অবস্থা ।

শিক্ষার্থীর বয়স ও মেধার সাথে সমন্বয়হীন শিক্ষা কারিকুলাম, সাবজেক্টের আধিক্য, সিলেবাসের ব্যাপকতা, শিক্ষাবর্ষের জন্য বরাদ্দকৃত সময়, পরিবেশ ইত্যাদি নানা কারনে শিক্ষার্থী এমনকি অভিভাবকগণও বর্তমান শিক্ষা নিয়ে ত্যাক্ত বিরক্ত ।শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে শিক্ষার সঙ্গে থাকলেও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিরানন্দ ও বোঝা সম এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিহে ফেলছে ।ক্ষেত্র বিশেষে পরিবারের একজনের শিক্ষার পিছনে পরিবারের সবাইকে শ্রম দিতে হচ্ছে, পেরেশানি ভোগ করতে হচ্ছে ।আর বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এ বিশেষ দুর্বলতাগুলোর সুযোগ নিচ্ছে এক ধরনের শিক্ষা ব্যবসায়ীগণ ।শিক্ষকগণ নিচ্ছে প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের সুযোগ, প্রকাশকগণ নিচ্ছে নোট ও গাইড বই বাণিজ্যের সুযোগ । শিক্ষা এখন পুরোপুরি একটা পণ্যের বৈশিষ্ট্য ধারন করে ফেলেছে ।

শিক্ষা ব্যবসায়িক পণ্য হতে পারে না । কারন একটি পণ্যের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকার দরকার শিক্ষার তা নেই । তাই কোন গবেষনাই শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করতে পারেনি । শিক্ষার উপকরন সমূহ পণ্য, এ যুক্তিতে কেউ কেউ শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ভবাতে চান যা একটি ভুল ভাবনা ।বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শিক্ষা একটি সেবা । পণ্য ও সেবার উপযোগিতা এক নয় । খুব সহজ একটি উদাহরনের সাহায্যে বিষয়টি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারনা লাভ করা যেতে পারে । ধরুন একজন বিশ লাখ টাকায় একটা গাড়ি কিনলেন । এখনে গাড়িটি পণ্য, ক্রেতা বিশ লাখ টাকা দিলেন গাড়িটি পেলেন । ক্রেতা গাড়িটির অস্তিত্ব, গাড়ীর কালার, গাড়ির ডিজাইন ইত্যাদি দেখতে পারেন । গাড়িটি ধরতে পারেন, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে পারেন, গাড়িটি রাস্তায় কেউ ভাংতেও পারেন । তাই গাড়ীর এসব বৈশিষ্ট্যের কারনে গাড়ি পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।

এবার ধরুন গাড়িটির একটা চাকার হাওয়া কমে গেল, গাড়ির মালিক হাওয়ার দোকানে নিয়ে চাকায় হাওয়া দিয়ে দোকানীকে বিশ টাকা দিলেন ।এখানে গাড়ির মালিক বিশ টাকা দিয়ে যা পেলেন তার কোন অস্তিত্ব, কালার, ডিজাইন ইত্যাদি দেখলেননা । ধরতে পারলেননা, ভাংতেও পারলেননা । তাই এসব বৈশিষ্ট্যের কারনে বিশ টাকা দিয়ে গাড়ির মালিক যা পেলেন তা সেবা হিসেবে স্বীকৃত । অর্থাৎ উপযোগিতা প্রাপ্তির দিক থেকে একটি পণ্য, অপরটি সেবা ।আমরা যখন পণ্য ক্রয় করি তখন পণ্যের মূল্য অনুযায়ী পণ্যটির সবকিছু কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্ত সার্ভিসের ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয় ।একজন সার্ভিস গ্রহীতার সার্ভিস পুরোপুরি পাওয়াটা নির্ভর করে সার্ভিস দাতার ইচ্ছার উপর ।

শিক্ষা হলো যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে তীরস্কারের মাধ্যমে আবিস্কার করে, নিজের অজ্ঞতাকে বিজ্ঞতায় পরিনত করে, নিজের পাশবিক প্রবৃত্তিকে মানবিক প্রবৃত্তিতে রুপান্তর করে, নিজের অন্তর্নিহিত পশুত্বকে মনুষ্যত্বে রুপদান করে, নিজের লোভকে সংবরন করার ক্ষমতা অর্জন করে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গীকে শাসন করার দক্ষতা অর্জন করে, নিজের চরিত্রের কালো দাগগুলি আলো দ্বারা ধৌত করে, নিজের সার্বিক আচরনের ইতিবাচক স্থায়ী উন্নয়ন-বিকাশ ও পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয় ।

শিক্ষাদান হলো একটি সেবা । এটি একটি শিল্পও বটে । একজন সত্যিকারের শিক্ষক তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতিকে শিল্পীর মত প্রতিনিয়ত শিল্পত্ব দান করেন । একজন সুশিক্ষক কখনও শিক্ষাদানের মত সেবাকে মুদি পণ্যের ওজনের মত কতটুকু দেবেন এটা নির্ধারন করেননা । একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কখনও শিক্ষাদানের মত সেবাকে জমির আয়তনের মত কি পরিমান দিবেন সেটাকে সময়ের ফ্রেমে পরিমাপ করেননা । একজন আদর্শ শিক্ষক কখনও শিক্ষাদানের মত সেবাকে ডিমের সংখ্যার মত কয়টি দিবেন সেটা সংখ্যায় বিচার করেননা ।

শিক্ষাকে বানাতে হবে শিল্প যেখানে উৎপাদন ও বিতরন হবে সেবা ।শিক্ষাকে পণ্যের কারখানা বানানোর অসাধু চিন্তা বন্ধ না করলে, মুখে যে গুণগত শিক্ষার কথা বলছি তা এখানে নয় খুজতে হবে অন্য কোন দেশে বা ভিন্ন কোন গ্রহে ।তাই শিক্ষা হোক সেবা শিল্প, পণ্যের কারখানা নয় ।
== লেখকঃ এ এস এম কামাল উদ্দিন (সহকারী অধ্যাপক)


Wednesday, December 13, 2017

অকর্ম’র সকর্ম ভাবনা (পর্ব -২) -পদ্ধতিই যেখানে অসদুপায় অবলম্বনের অনুপ্রেরণা ।

 অকর্ম’র সকর্ম ভাবনা (পর্ব -২)
বিগত পর্বে ‘পরীক্ষার্থীর যোগ্যতার মূল্যায়ন বনাম সহানুভূতির পুরস্কার’ শিরোনামে লেখাটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল- কম বেশি নব্বই ভাগ পরীক্ষার্থীই এখন পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার যোগ্যতার জন্য নম্বর পায়না, কষ্ট করে পৃষ্ঠা ভরে কিছু একটা লেখার জন্য পরীক্ষকের সহানুভূতির পুরস্কার পায় ।

এ পর্বেও বাংলায় সে প্রবাদটি দিয়ে শুরু করছি, ‘কইলে মা মারন খায়, না কইলে বাপ হারাম খায়’ ।অর্থাৎ এক ধরনের উভয় সংকট পরিস্থিতি । আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অনেক সত্য কথা কইতে পারা এবং সইতে পারা উভয়ই কঠিন । বাস্তব চিত্র তুলে ধরলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষ কম বেশি সকলেরই গায়ে লাগার কথা ।তবুও কাউকে না কাউকে বলতে হবে, সচেতন মানুষদের এ নিয়ে ভাবতে হবে । নাহলে আমরা মুখে যে গুণগত শিক্ষার কথা বলছি তা অর্জন হবে সুদূর পরাহত ।

আমরা ক্লাসগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখি কয়েক ধরনের মেধার শিক্ষার্থী রয়েছে । খুব নগন্য সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা মেধাবী স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য ।স্বল্প সংখ্যক রয়েছে যারা মধ্যম মেধার এবং বড় একটি অংশ রয়েছে সাধারন মেধার । কিন্ত একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় সমবয়সী এসব শিক্ষার্থীর অনেকগুলো কমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দেখলে এদের মধ্যে মেধার এতটা তারতম্য রয়েছে তা মনে হয়না । আমার ব্যক্তিগত ধারনা অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মেধাবী । কিন্ত পরিবেশের নানা প্রভাবে এদের মেধার তারতম্য ঘটে থাকে । বিশেষ করে পরিবার, সামাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষা ব্যবস্থা, যথাযথ কাউন্সেলিং ইত্যাদির ভুমিকাই প্রধানতঃ এর জন্য দায়ী ।আবার কিছু আছে প্রাকৃতিকভাবেই কম মেধা সম্পন্ন । তবে কারন যাই হোকনা কেন এগুলি নিরসন করা কোন পক্ষের পক্ষেই অতটা সহজ কাজ নয় ।কিন্ত তাই বলে প্রচেষ্টাতো থেমে থাকতে পারেনা ।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে পদ্ধতি চালু আছে তা সকলের জন্য একই রকম । বিষয়টি আর একটু ব্যাখ্যা করে বলা প্রয়োজন । আমাদের দেশে তিন পদ্ধতির শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে যেমন – সাধারন শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা । সাধারন শিক্ষায় যে সিলেবাস রয়েছে তা সাধারন শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত সকল স্তরের মেধার শিক্ষার্থীর জন্যই প্রযোজ্য । তেমনি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য ।আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে, সকল শিক্ষার্থীর এমন কি সকল অভিভাবকেরও শিক্ষার লক্ষ্য বা চাহিদা এক রকম নয় ।শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে একদল আছে খুবই আত্নবিশ্বাসী এবং উচ্চাকাংখী, যেখানে শিক্ষার্থী বড় মাপের কিছু একটা হতে চায় বা অভিভাবক সন্তানকে বড় মাপের কিছু একটা বানাতে চায় । 

আরেক দল আছে তাদের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য নেই, নেই সেরকম আত্নবিশ্বাস । এরা সাধারন প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে সাধারন কিছু হতে পারলেও তারা সন্তুষ্ট হয় ।একদল অন্য কোন কাজ নেই তাই পড়তে হবে বলে পড়ে । এরা একেবারেই লক্ষ্যহীনভাবে স্টুডেন্ট লাইফের সঙ্গে থাকে ।এদের সাধারন উদ্দেশ্য থাকে পাশ করে একটা সনদ অর্জন করা । অন্য একদল আছে যাদের উদ্দেশ্য শিক্ষার সঙ্গে লেগে থাকা । পথিমধ্যে বিয়ে বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে স্টুডেন্ট লাইফকে গুডবাই জানিয়ে সংসার বা কর্ম জীবনে চলে যাওয়া ।

শিক্ষার্থীর চাহিদার তারতম্যের কারনে শিক্ষার্থীর পড়া-লেখার পদ্ধতিতেও তারতম্য ঘটে থাকে ।যে যা ফল প্রত্যাশা করে সে অনুযায়ীই পরিশ্রম করে । প্রথম লাইনের স্টুডেন্টরা শ্রম দিয়ে পড়তে চায়, ক্লাস করে শিখতে চায়, নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা দিতে চায়, শ্রম অনুযায়ী সেরা ফল অর্জন করতে চায় ।কিন্ত পরবর্তী লাইনের স্টুডেন্টদের মধ্যে এসব গুণ খুব কমই পরিলক্ষিত হয় ।আগেই বলেছি একই ধারার জন্য প্রণীত সিলেবাস ঐ ধারার সকল শিক্ষার্থীর জন্য প্রযোজ্য । মেধার স্তরগত পার্থক্যের কারনে সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে এ সিলেবাসের ভার বইতে পারা সম্ভব হয়ে ওঠেনা ।মেধাবী, মধ্যম মেধাবী ও কম মেধাবী সকল শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হয় কিন্ত পরীক্ষার জন্য এদের প্রস্ততিতে থাকে বিরাট ব্যবধান ।একই হলে মেধার দিক থেকে সকল স্তরের পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেয় বলে সাধারন প্রস্তুতি গ্রহনকারী পরীক্ষার্থীরা নকল করে লেখা বা অন্যের দেখে দেখে লেখার প্রতি বেশি আগ্রহী হয় ।এক পর্যায়ে পরিবেশের প্রভাবে ভাল মন্দ মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় ।

ইদানিং আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে নকল পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে ।নকল যেন পরীক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়ে যাচ্ছে ।যত চেষ্টাই করছি নকলকে কোনভাবেই যেন আমরা রুখতে পারছিনা । আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গেই যেন নকল জড়িয়ে আছে আঠার মত ।চার জনকে আলাদা অবজেক্টিভ প্রশ্নের সেট বিলি করলেও কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে চার জনের একই সেট হয়ে যাচ্ছে যেন জাদুর মত ।এভাবে নকলের সূত্রপাত হচ্ছে পরীক্ষা শুরুর প্রথম মিনিট থেকেই যা বিভিন্ন কৌশলে অব্যাহত থাকে পরীক্ষার শেষ মিনিট পর্যন্ত ।

পরীক্ষার্থীর তুলনায় হলে কর্তব্যরত পর্যবেক্ষকের সংখ্যার অপ্রতুলতা এবং পারিপার্শ্বিক নানা কারনে হল পর্যবেক্ষকের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া রিতীমত এক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে ।ফলে দিন দিন পরীক্ষার্থীর নকল প্রবনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষকের নিয়ন্ত্রন বিমুখতার কারনে কিছু অসচেতন ও অসাধু অভিভাবকও এ নকলের মহোৎসবে শরীক হয়ে যাচ্ছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বুঝে অথবা না বুঝেই ।এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় খুজতে হবে সকল সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিককে ।নইলে এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম নিমজ্জিত হবে এক নকলের মহা সমূদ্রে । এখনই প্রতিকার করতে না পারলে পরে অরাজকতার মহাসাগর থেকে প্রজন্মকে উদ্ধারের চেষ্টা হবে কলা গাছের ভেলায় চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়ার মত বৃথা চেষ্টার শামিল । 

== লেখকঃ এ এস এম কামাল উদ্দিন (সহকারী অধ্যাপক)

রিলেটেড পোস্টসমূহ-  

Monday, December 11, 2017

অকর্ম’র সকর্ম ভাবনা (পর্ব -১) -পরীক্ষার্থীর যোগ্যতার মূল্যায়ন বনাম সহানুভূতির পুরস্কার ।

কম-বেশি নব্বই ভাগ পরীক্ষার্থীই এখন পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার যোগ্যতার জন্য নম্বর পায়না, কষ্ট করে পৃষ্ঠা ভরে কিছু একটা লেখার জন্য পরীক্ষকের সহানুভূতির পুরস্কার পায় । এমতাবস্থায় আমাদের শিক্ষার ফলাফলকে গণনা করা গেলেও ওজন করা যাচ্ছেনা ।তুলার বস্তা দেখতে অনেক বড় কিন্ত ওজনে অনেক হালকা ।আমাদের পরীক্ষার্থীদের অধিকাংশ পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখতে অনেক মোটা কিন্ত গুনগত মান বলতে যা বুঝায় তা নেই প্রায় ৯০ ভাগ উত্তরপত্রেই । তাহলে কী লিখছে অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ?

অনেক কিছুইতো লিখছে । পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখছে । মূল উত্তরপত্র শেষ করে ৪-৫টা করে অতিরিক্ত উত্তরপত্র লিখছে ।দু’আড়াই ঘন্টায় কেউ কেউ ৩০-৪০ পৃষ্ঠা লিখছে, কেউবা তারও বেশি লিখছে । যা মনে আসছে তা লিখছে । যা খুশি তা লিখছে । যা ইচ্ছা তা লিখছে ।এখান থেকে কিছু আর ওখান থেকে কিছু নিয়ে লিখছে । ডান থেকে কিছু আর বাঁ থেকে কিছু নিয়ে লিখছে । সামনে থেকে কিছু আর পেছন থেকে কিছু নিয়ে লিখছে । একবার উদ্দীপক’র শেষ থেকে কিছু অংশ নিয়ে উদ্দীপক’র প্রথম অংশ জোড়া দিয়ে লিখছে । আবার উদ্দীপক’র মাঝখান থেকে কিছু অংশ নিয়ে উদ্দীপক’র প্রথম অংশ জোড়া দিয়ে লিখছে । একবার এ উদ্দীপক থেকে কিছু আবার ঐ উদ্দীপক থেকে কিছু নিয়ে লিখছে । ইংলিশ অক্ষরে বাংলা উচ্চারন লিখছে, আর বাংলা অক্ষরে ইংলিশ উচ্চারন লিখছে ।বড় বড় সাইজে দু’তিন বাক্যে ১৫-২০ শব্দ ফাঁক ফাঁক করে লিখে এক একটা পৃষ্ঠা ভরছে আর পৃষ্ঠার সংখ্যা বাড়াচ্ছে ।  
সত্যি বলতে গেলে আমাদের বর্তমান শিক্ষার্থীদের ধৈর্য্য অনেক কম । পরিবেশের নানা প্রভাবে আমাদের বর্তমান জেনারেশনের অধিকাংশের কর্মক্ষমতাও অনেক কম ।বিশেষ করে যাদের বয়স এখন কৈশোর অতিক্রম করতে যাচ্ছে এদের ক্ষেত্রেই কথাটি বেশি প্রযোজ্য । এ জেনারেশনটি ভেজাল খাদ্য ও শিক্ষা বাণিজ্যের কবলে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ।বয়স অনুযায়ী শিক্ষায় অতিরিক্ত বিষয়, বিশালকায় সিলেবাস, অপ্রয়োজনীয় বই ব্যাগে ভরে কাঁধে করে বয়ে বেড়ানো ইত্যাদি অপ্রত্যাশিত পরিশ্রম তাদেরকে একদিকে করছে খর্বকায় অন্য দিকে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শিক্ষা ভীতি ও অনীহা । শিক্ষার চাপ একদিকে শিক্ষার্থীর আনন্দের জগতকে করে দিচ্ছে সংকুচিত, অন্যদিকে বাধ্য হয়ে বইয়ের পোকা হতে গিয়ে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা হচ্ছে বাধাগ্রস্ত ।তাছাড়া রয়েছে একই বয়সের শিক্ষার্থীদের একের সাথে অন্যের মেধার তারতম্য ।নগন্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এটাকে কষ্ট করে হজম করতে পারলেও অধিকাংশেরই বদহজম হয়ে যাচ্ছে । এ বয়সে একজন ছেলে বা মেয়ের কর্ম জীবনে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে বাধ্য হয়ে শিক্ষা জীবনেই থাকতে হচ্ছে ।অন্যেরা পড়ছে তাই তাকেও সাধ্যমত কিছু না কিছু পড়তে হচ্ছে । অন্যেরা পরীক্ষা দিচ্ছে তাই তাকেও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে । অন্যেরা লিখছে তাই তাকেও কিছু না কিছু লিখতে হচ্ছে । অন্য দিকে সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে অপ্রিশিক্ষিত শিক্ষকের ভুল ব্যাখ্যা বা শেখানোর ভুল পদ্ধতি শিক্ষার্থীকে যাচ্ছেতাই শিখতে বা আবোল তাবোল লিখতেও অনুপ্রাণিত করছে ।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘কইলে মা মারন খায়, না কইলে বাপ হারাম খায়’ । এক ধরনের উভয় সংকট পরিস্থিতি । আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অনেক সত্য কথা কইতে পারা এবং সইতে পারা উভয়ই কঠিন । বাস্তব চিত্র তুলে ধরলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষ কম বেশি সকলেরই গায়ে লাগার কথা । তবুও বলতে হবে, সচেতন মানুষদের এ নিয়ে ভাবতে হবে। নাহলে আমরা মুখে যে গুণগত শিক্ষার কথা বলছি তা অর্জন হবে সুদূর পরাহত ।

বর্তমান সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিতে প্রাকটিক্যাল যুক্ত বিষয় ব্যতীত অন্য সব বিষয়ে ৭টি উদ্দীপকের বিপরীতে ২৮ টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয় । একজন শিক্ষার্থী সারা বছর কিছু না পড়েই ২৮টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারে ।কী পদ্ধতিতে পারে তা এ নিবন্ধের দ্বিতীয় প্যারায় উল্লেখ করা হয়েছে ।কোন উত্তরই সঠিক হয়নি অথচ ২৮ টি প্রশ্নের উত্তরই লিখেছে, কেউ কেউ ২৫-৩০ পৃষ্ঠা লিখেছে, কেউবা কৌশল অবলম্বন করে ৩০-৪০পৃষ্ঠাও লিখে পৃষ্ঠার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে, সেক্ষেত্রে প্রতিটি উত্তরের জন্য একটি করে জিরো দিয়ে ২৮ টি জিরো দেয়া একজন পরীক্ষকের জন্য একটি বিরাট কঠিন বিষয় ।তাছাড়া নানা ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার বিড়ম্বনা এড়াতেও পরীক্ষক এমন ঝুঁকি নিতে চাননা । যে কারনে কম-বেশি নব্বই ভাগ পরীক্ষার্থীই এখন পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার যোগ্যতার জন্য নম্বর পায়না, কষ্ট করে পৃষ্ঠা ভরে কিছু একটা লেখার জন্য পরীক্ষকের সহানুভূতির পুরস্কার পায় । এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় বের করতে না পারলে তথাকথিত শিক্ষিত তৈরি হয়ে দেশ ভরে যাবে, কিন্ত না আসবে দেশের কাজে-না আসবে দশের কাজে ।


=== লেখকঃ এ এস এম কামাল উদ্দিন, (সহকারী অধ্যাপক)




Sunday, December 3, 2017

প্রশ্নপত্র ফাঁস : পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়া যেন অধিকারে পরিণত না হয়।

ভাল হোক আর মন্দ হোক, কোন সিস্টেম যদি দীর্ঘ সময় ধারাবহিকভাবে চলতে থাকে সেটা এক সময় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় । যেমন বিভিন্ন বিষয়ে জনমত তৈরি করতে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সে বিষয়ে জনমত গঠিত হয় এবং এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত নিয়মেও পরিণত হয় ।

বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে পরীক্ষার আগেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে ।প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষায় অনুষ্ঠিত এমন কোন পাবলিক পরীক্ষা নেই যার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে ফাঁস হয়না । শুধু পাবলিক পরীক্ষা নয় বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যাল সহ যেসকল ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় সেগুলির প্রায় সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়ে যায় পরীক্ষার পূর্বেই । বিসিএস সহ কোন ধরনের প্রতিযোগিতামূলক চাকুরির পরীক্ষা বাদ নেই যেটার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার পূর্বে ফাঁস হচ্ছেনা । এগুলির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটা এখন মামুলি ব্যাপারে পরিনত হয়েছে ।

ভেবেছিলাম এ বছর হয়তো প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে ফাঁস হবেনা । কিন্ত না এবারও প্রশ্নপত্রকে রেহাই দেয়া হয়নি । তবে পরীক্ষার পুর্বেই প্রশ্নপত্র ফাঁস সংস্কৃতি শুরু হওয়ার প্রথম দিকের চরিত্রের সঙ্গে এখনকার চরিত্রের কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে ।প্রথম অবস্থায় মানুষের মধ্যে এ বিষয়টিকে নিয়ে যতটা সমালোচনা পরিলক্ষিত হয়েছিল বা বিষয়টাকে যতটা ঘৃনা করেছিল এখন আর ততটা সমালোচনা বা ঘৃনা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা ।ধীরে ধীরে মানুষ যেন এটাকে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার বলে ইচ্ছা না থাকলেও মেনে নিচ্ছে । যে প্রযুক্তির বদৌলতে এসব খবর জেনে যেসব মানুষ ঘৃনাভরে সমালোচনা করেছিলেন, সে প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের অনেকেই এখন নিজ সন্তানের জন্য পরীক্ষা পূর্ব প্রশ্নপত্র খুঁজছেন । সত্যি বললে বলতে হয়- প্রযুক্তি আমাদের কাজ কর্মকে যতটা গতিশীল করেছে, নৈতিকতাকে তার চেয়েও বেশি বিপন্ন করেছে । তবে এটা প্রযুক্তির দোষ নয়, দোষ হলো মানুষের কুপ্রবৃত্তির ।

মানুষকে বলা হয় পরিবেশের দাস । যেকোন পরিবেশ মানুষকে সেরকম করে ফেলে । বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বচনটি একেবারেই প্রমাণিত । প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীরাও নকল করার প্র্যাকটিস করছে, পরীক্ষা পূর্ব প্রশ্নপত্র পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছে । মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিকের কিশোরদের মাঝে এ প্রবণতা আরও প্রকট । উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এটা যে ভয়াবহতা লাভ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা । শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যদের উদাহরন দিয়ে নিজেদের নকল করা বা পরীক্ষা পূর্ব প্রশ্ন পাওয়াকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে । অনেক শিক্ষককেও এখন পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব কাজে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে । আগে যাদেরকে চরম সমালোচনা করতে দেখা যেত এখন তারা এ্যাঁ ওঁ বা মিন মিন করে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন । অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এক হয়ে পরীক্ষার পূর্বে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের পিছনে দৌড়ছেন ।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এ অনৈতিক কাজের জন্য কেউ দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেনা । কেউ শাস্তি পাচ্ছেনা । ফাঁস হওয়াকে অনেক ক্ষেত্রে ফাঁসও বলা যাচ্ছেনা । বিষয়টি যেভাবে স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি লাভ করছে তাতে ভয় হচ্ছে যে, এটি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় কিনা । এরশাদ সাহেবের আমলে ভোটের অবস্থা কেমন ছিল তাতো সবার জানাই আছে । তৎকালে ছাত্ররা নকলের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোথাও কোথাও এমন স্লোগান দিতেও শোনা যেত-‘ ভোট হয়েছে যেভাবে, পরীক্ষাও হবে সেভাবে’। 

এখন আমাদের যেভাবে পরীক্ষার পূর্বেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, সেটা যদি ধারাবাহিকভাবে আরও চলতে থাকে তাহলে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অধিকারেও রুপ নিতে পারে । শিক্ষা ব্যবস্থাই যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে আর থাকলো কী ? ধ্বংসই যদি উদ্দেশ্য না হয় তবে বলব প্লিজ আর না, যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে, এবার বন্ধ করুন । তা নাহলে ভবিষ্যতে জাতিকে এমন স্লোগানও শুনতে হতে পারে- ‘পরীক্ষার আগে প্রশ্ন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে ।’

==== এ এস এম কামাল উদ্দিন, সহকারী অধ্যাপক ====

Thursday, November 30, 2017

ক্যাডার নন-ক্যাডার পদমর্যাদার দ্বন্দ্ব : তিরস্কার নয়, আলোচনাই হোক সমাধান ।

ক্যাডার নন-ক্যাডার পদমর্যাদার দ্বন্দ্ব : তিরস্কার নয়, আলোচনাই হোক সমাধান ।

একটি প্রবাদ আছে, ‘মক্কায়ও চোর আছে, লঙ্কায়ও  ভিখারী আছে ।’ আসলে  ভাল   বা  মন্দ  সব জায়গায়ই  আছে,  পার্থক্য  শুধু সংখ্যায় কম আর বেশি । দু’এক জন  দূর্নীতিবাজ  রাজনৈতিক ব্যক্তির কারনে বলা যাবেনা সব রাজনৈতিক ব্যক্তিই দূর্নীতিবাজ । দু’এক জন অসৎ পুলিশের কারনে বলা যাবেনা সব পুলিশই অসৎ । দু’এক  জন  চরিত্রহীন শিক্ষকের কারনে  বলা  যাবেনা  সব সব শিক্ষকই  চরিত্রহীন । সার্টিফিকেট থাকলে  শিক্ষিত বলা  যায় কিন্ত সুশিক্ষিত হওয়া ভিন্ন জিনিষ ।

ইদানিং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্যাডার-নন ক্যাডার বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে । চলছে কর্ম বিরতি এমনকি সভা সমাবেশও । ক্যাডার মর্যাদা পাওয়া-দেওয়া নিয়ে যে যার মত করে যুক্তি দিচ্ছেন, তর্ক করছেন । যে কোন বিষয় নিয়ে যুক্তি তর্ক থাকবে এটা যেমন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার । কিন্ত পেশা ভেদে এ যুক্তি তর্ক উপস্থাপনের পদ্ধতির মধ্যেও পার্থক্য থাকবে এটাও তেমনি একটা স্বাভাবিক ব্যাপার । শ্রমজীবি মানুষের যুক্তি তর্ক আর বুদ্ধিজীবি মানুষের যুক্তি তর্ক একই রকম হলে মানুষ চিনবে কীভাবে কে শ্রমজীবি? আর কে বুদ্ধিজীবি? অবশ্যই উপস্থাপন, প্রকাশ ভঙ্গী, শব্দ চয়ন, বডি লেংগুয়েজ, সহনশীলতা ইত্যাদির মাধ্যমে । ইদানিং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্যাডার-নন ক্যাডার বিষয়টি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে সেখানেও পেশার সর্বোচ্চ মর্যাদা রক্ষা করেই যুক্তি তর্ক হবে এটাইতো কাম্য হওয়ার কথা । বাঘ আর সিংহের ভাগাভাগির লড়াইয়েও শেষ পর্যন্ত কম্প্রোমাইজ হয় । এক পর্যায়ে উভয় উভয়কে মেনে নেয় । ক্যাডার নন-ক্যাডার দ্বন্দের অবসানও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে হতে পারতো, কাদা ছোড়াছুড়ি করে নয় । কিন্ত দুঃখ জনক ভাবে সত্য যে, আমরা নিজেরা নিজেদেরকে সর্বোচ্চ শিক্ষিত, বিজ্ঞ, মেধাবী দাবি করে সম পেশার অন্যদেরকে হেয় করছি অনেকটা নির্বোধের মতই ।
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ সেবাই প্রদান করছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এখানে রয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ শিক্ষক কর্মচারী । দেশের অধিকাংশ বড় বড় কর্মকর্তাগণ বেশিরভাগই এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাগ্রহনকারী । বিশেষকরে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি (পাস) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সেবার সিংহভাগই পূরন করে বেসরকারি শিক্ষা খাত । দেশের পাবলিক বিশ্বদ্যিালয়গুলোতেও উল্লেখযোগ্য হারে মেধার স্বাক্ষর রাখছে এসব নন-গভর্নমেন্ট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনের শিক্ষার্থীরা ।আমাদের দেশে সবচাইতে সনামধন্য এবং শিক্ষা ও ফলাফলের দিক থেকে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানুষ এখনও নটরডেম কলেজ, ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ, হলিক্রস স্কুল এন্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজ সহ সারা দেশের এরকম আরও অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই বুঝে ।এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হওয়ায় এখানে কোন ক্যাডার শিক্ষক নেই ।মজার বিষয় হলো এসব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েই অনেকে ক্যাডার হচ্ছেন ।

উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় উর্তীর্ন হয়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যাল এমনকি ওয়াল্ড র‌্যাঙ্কিং তালিকার শীর্ষের দিকে থাকা ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ইত্যাদি ইউনিভারসিটিতে যারা চান্স পাচ্ছে তাদের সংখ্যা জেনে নিলে বুঝা যাবে এক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষার অবদান মোটেই অবজ্ঞা বা অবহেলা করার মত নয় । প্রতি বছরই বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যাল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাশ করে বের হচ্ছে । মেধার দিক থেকে এরা প্রায় সম পর্যায়ের ।এসব হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর বিসিএস পরীক্ষায় অংশ গ্রহনও করছে ।আমাদের দেশে সরকারি চাকুরির বাজার সীমিত হওয়ায় বিসিএস পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে উর্তীর্ন অল্প সংখ্যক মানুষের চাকুরি হচ্ছে ।অন্যদিকে প্রশ্ন সংক্রান্ত কেলেংকারীর কথা আলোচনায় নাইবা আনলাম কিন্ত কোটা প্রথার ফলে অনেকের যোগ্যতা থাকা সত্বেও ডিসকোয়ালিফাই হয়ে যাচ্ছে একথাতো অস্বীকার করার মত নয়।

যারা প্রায় সম যোগ্যতার হয়েও বিসিএস কোয়ালিফাই করতে পারেননি তাদের অধিকাংশই চলে যায় বেসরকারি শিক্ষা পেশায়, কেউ যায় ব্যাংকিং বা বীমা পেশায়, কেউ সাংবাদিতা পেশায়, কেউ আইন পেশায়, কেউ যায় দেশী বিদেশী কোম্পানীতে, কেউ যায় এনজিও সহ অন্যান্য পেশায় । এসব যায়গায় থাকা অবস্থায় অনেকে ক্যাডার বা নন ক্যাডার জবের জন্য চেষ্টা করে সফলও হয় । কেউ নানা কারনে সংশ্লিষ্ট পেশায়ই থেকে যায় বা কোথাও যাওয়ার চেষ্টাও করেনা । বিগত ৩৫তম বিসিএস এ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উর্তীর্ন হয়েছিল ৫ হাজার ৫১৭ জন । তন্মধ্যে ২ হাজার ১৫৮ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি ।প্রায় একই যোগ্যতা সম্পন্ন অবশিষ্টদেরকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন ক্যাডার পোস্টে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছিল । যতদূর জানি তাঁদের মধ্য থেকে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ।তাহলে প্রায় একই যোগ্যতা থাকার পরও শুধু ক্যাডার পদ পাননি বলে তিঁনি কি ক্যাডারদের কাছে নিগৃহীত হবেন ?

আমাদের দেশে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যে প্রতিষ্ঠানের এখনও এমপিও হয়নি কিন্ত সে প্রতিষ্ঠানে এমন শিক্ষকও আছে যাঁর একাডেমিক রেজাল্ট, শিক্ষকতার দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, বিনয়, সততা, নিষ্ঠা, পেশার প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি কোন কোন ক্যাডার শিক্ষককেও হার মানাবে । আবার আমাদের দেশে সদ্য বিসিএস কোয়ালিফাই করা আমাদের ছাত্র সমতুল্য এমন মেধাবী শিক্ষকও আছেন যাঁরা শিক্ষকতায় পঁচিশ বছর অতিবাহিত করা আমাদের মত শিক্ষককেও পড়াতে পারবেন ।

পরিশেষে একজন সম্মানিত ক্যাডার শিক্ষকের একটি কর্মের কথা বলেই শেষ করতে চাই ।লেখার শুরুতে দেয়া স্ক্রীনশটটি একজন সম্মানিত ক্যাডার শিক্ষকের ফেসবুক আইডি (তাঁর সম্মান রক্ষার্থে প্রোফাইল ফটো ও নামটি মুছে দিয়ে স্ক্রীনশটটি ব্যবহার করা হলো) । বর্তমানে ক্যাডার নন-ক্যাডার বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সম্প্রতি জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকগণকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পোস্টটি দিয়ে মূলত তিঁনি সমগ্র বেসরকারি শিক্ষকগণকেই তিরস্কার করেছেন । তাঁর পোস্টটি দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিঁনি শিক্ষক হয়ে জাতিকে কী শিক্ষা দিচ্ছেন ।

প্রতিযোগিতা থাকবে, হার জিত থাকবে, তাই বলে যারা হারবে তাদের অপমান করতে হবে ? দু’টি শক্তিশালী দলের মধ্যে যখন ক্রিকেট খেলা হয়, তাদের এক দল যদি এক রানে জয়লাভ করে তাহলে কি পরাজিত দলকে বলা হবে তারা অযোগ্য ? বিসিএস ক্যাডারের চিন্তা আর রাজনৈতিক ক্যাডারের চিন্তা কি একই রকম হওয়া উচিত ?

একজন ক্যাডার শিক্ষকের নিকট থেকে বেসরকারি শিক্ষকদেরকে তিরস্কারের এমন ভাষা কাম্য নয়। তাই আসুন  ভদ্র ও মার্জিত  ভাষায় এর প্রতিবাদ করি, নিন্দা  জানাই । ক্যাডার-নন ক্যাডার, সরকারি- বেসরকারি, দল-মত  নির্বিশেষে  সকল  স্তরের  শিক্ষক উৎকৃষ্ট ভাষায় এ ধরনের গর্হিত কাজের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করি । শিক্ষকতার মত মহান পেশাকে সকল নিকৃষ্টতার উর্ধ্বে রাখি ।

== এ এস এম কামাল উদ্দিন, বেসরকারি কলেজ শিক্ষক ।

Featured post

অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী স্মরণে।

অধ্যক্ষ এম এ বারী ছবিটি স্যারের জৈষ্ঠ পুত্র জনাব সাজ্জাদুল বারী ’র নিকট থেকে সংগৃহীত।  আমার প্রথম বস অধ্যক্ষ জনাব এম এ বারী। আজ থেকে ঊনত্রিশ...